অতি প্রাচীনকালে। সমস্ত পৃথিবী তখন এক রাজার শাসনে চালিত হত। সে রাজার নাম হলো সুরথ। যেমন ধার্মিক তেমনি ন্যায় পরায়ন তেমনি কোমল উদার। সেই উদারতা আর কোমলতার সুযোগে চারিদিক থেকে যবনেরা মাথা তুলে উঠল। একটু একটু করে তারা সুরথ রাজার রাজ্য গ্রাস করতে লাগলো। কালক্রমে তারা বলশালী আর সংঘবদ্ধ হয়ে রাজা সুরথের রাজধানী আক্রমন করলো। আত্মীয় স্বজন সকলেই রাজা সুরথকে পরিত্যাগ করে পালালো। তখন পরাজিত সুরথ রাজ্য, রাজপ্রাসাদ, স্ত্রী পুত্র, আত্মীয় স্বজন সকলকে ত্যাগ করে একাকি নিবিড় অরন্যে আশ্রয় নিলেন। অরন্যে অরন্যে গাছের তলায় দিন আর রাত কাটে। অরন্যের ফলমূল খেয়ে কোনো রকমে প্রানধারন করেন। তৃষ্ণার সময় ঝর্নার কাছে গিয়ে অঞ্জলি ভরে জলপান করেন। সারাক্ষন অন্তরে জ্বলতে থাকে দুর্ভাবনা। নিজের রাজ্যের জন্যে দুর্ভাবনা নয়, তিনি ভাবেন তার অবর্তমানে তার আত্মীয় স্বজনেরা কি করছে? শত্রুদের হাতে হয়ত তারা নির্যাতিত হচ্ছে, হয়ত অশ্রুজলে উপবাসে তাদের দিন কাটছে। নিজের দুঃখ ভুলে সুরথ অসীম মমতায় তার আপনজনদের দুঃখের কথাই ভাবেন। এক একবার তার মনে হয় কেনো তাদের কথা ভেবে তিনি এই নিদারুন কষ্ট পাচ্ছেন? তার বিপদের সময় তারাই তো সর্বপ্রথম তাকে ত্যাগ করেছিল অথচ তিনি কেনো অষ্টপ্রহর তাদেরই কথা ভাবছেন? মনে মনে স্থির করেন আর অপরের কথা ভাববেন না কিন্তু অতর্কিতে দেখেন কখন সেই তাদেরই কথা তার সমস্ত অন্তর জুড়ে তাকে ব্যথিত করে রেখেছে। দুর্ভাবনায় পাগলের মতো বনে বনে ঘুরে বেড়ান। হঠাৎ একদিন দেখতে পেলেন তারই মতোন নিঃসঙ্গ একজন লোক বিষন্ন মুখে গাছতলায় বসে আছে। রাজা সুরথ লোকটির কাছে এগিয়ে গিয়ে বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করেন কে ভাই তুমি? এই জনহীন নিবিড় অরন্যে একা বসে কি ভাবছো?
সেই সহানুভূতির স্পর্শে লোকটির দুচোখ অশ্রু সজল হয়ে ওঠে। বলে আমার দুঃখের কাহিনী কাউকে বলবার নয়। আমার নাম সমাধি বৈশ্য। এক সময়ে আমার চেয়ে ধনী বনিক আর কেউ ছিল না। অকাতরে যেমন ধন উপার্জন করেছি তেমনি অকাতরে সেই ধন দরিদ্র নিঃস্ব লোকেদের বিতরন করতাম। লজ্জার কথা কি বলবো আমার নিজের স্ত্রী পুত্রেরা আমার সেই দানের সবচেয়ে বড় বাঁধা হয়ে উঠল এবং তারাই ষড়যন্ত্র করে আমার জীবন নাশের চেষ্টা করে। কোনো রকমে প্রান নিয়ে এই অরন্যে পালিয়ে এসেছি।
রাজা সুরথ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন হে বন্ধু আমাদের দুজনারই ভাগ্য একরকম বলে বিধাতা আজ আমাদের এই অরন্যে মিলিয়ে দিয়েছেন। সমাধি বৈশ্য বলেন কিন্তু আমার আসল দুঃখের কথা আপনাকে এখনো বলা হয়নি। আমার টাকা কড়ি অর্থ সর্বস্ব গিয়েছে বলে আমার দুঃখ নেই। আমি এই নির্জন অরন্যে বসে অষ্টপ্রহর তাদেরই দুর্ভাবনায় কাঁদছি, যারা আমার সঙ্গে এই শত্রুতা করেছে। যত চেষ্টা করছি আর তাদের কথা ভাববো না ততই তাদের মুখ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠছে, ততই তাদের বিরহে মনটা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। আমি বনিক, লেখাপড়া বিশেষ কিছুই জানি না। তাই আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি, বলতে পারেন কেনো এ রকম হচ্ছে? যারা করলো জীবনের চরম শত্রুতা কেনো তাদের কথা ভেবেই বুকে জেগে উঠছে হাহাকার?
সমাধিকে বুকে জড়িয়ে ধরে সুরথ বলেন বন্ধু তোমার সঙ্গে আমার আশ্চার্য মিল, যাদের সহায় না পেয়ে আজ আমি রাজ্যচ্যুত, আশ্রয়চ্যুত, এই অরন্যে তাদের কথা ভেবেই অষ্টপ্রহর আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আমিও বিস্ময়ে ভাবছি কেনো এমন হয়? এর কোনো উত্তরই আমি খুঁজে পাচ্ছি না। এইভাবে সেই জনহীন অরন্যে রাজ্যহারা সুরথ আর সর্বস্বহারা সমাধি বৈশ্যের নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে উঠল।
একদিন তারা ঘুরতে ঘুরতে দেখতে পেলেন সামনেই এক ঋষির আশ্রম। মেধা ঋষির আশ্রম। আশ্রমের ভেতর গিয়ে তারা দুজনে ঋষির চরনে লুটিয়ে পড়লেন এবং আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। তাদের জীবনের কাহিনী শুনে মেধা ঋষি সস্নেহে তাদের আশ্রয় দিলেন।
তখন রাজা সুরথ ঋষিকে জিজ্ঞেস করলেন হে মহাজ্ঞানী একটা প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে আমরা দুজনেই বড় ব্যথিত আছি। আপনাকে তার উত্তর দিতে হবে। যে আত্মীয় স্বজনেরা আমাদের শত্রুতা করেছে আমরা কেনো তাদেরই কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছি।
ঋষি হেসে বললেন, বৎস এর নাম হলো মমতা, মায়া। এই মায়া দিয়েই জগৎ সংসারকে নারায়ন বেঁধে রেখেছেন। মহাদেবী মহামায়ার এই হলো খেলা।
আধ্যাত্বিক হোক বা জাগতিক যে এই মহামায়ার বন্ধন কে ছিন্ন করতে পারবে সেই প্রকৃত পক্ষে সিদ্ধিলাভ করতে পারবে ।